তাসাওউফের পরিচয়

মুসলিম দর্শনে তাসাওউফ কথাটি সূফীবাদ নামে খ্যাত। মুসলিম জাতির জীবনধারার অন্যান্য দিকের মত তাসাওউফ কুরআন-হাদীসের শিক্ষার উপর প্রতি‘িত। আলামা শামী (রহঃ) বলেছেন, “ইলমে তাসাওউফ হল ‘আধ্যাত্মিক জ্ঞান‘, যে জ্ঞানের সাহায্যে মানুষের সৎগুণ সমূহের প্রকারভেদ এবং তা অর্জনের পন্থা ও অসৎ গুণসমূহের প্রকারভেদ এবং তা আত্মরক্ষার উপায় অবগত হওয়া যায়।”

শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া আল-আনছারী (রহঃ) ইলমে তাসাওউফের সংজ্ঞা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন,
“যে ইলমের দ্বারা অনন্ত সৌভাগ্য লাভের উদ্দেশ্য আত্মশুদ্ধি ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের প্রক্রিয়া এবং মানুষের জাহির ও বাতিন গঠন করা সম্বন্ধে অবগত হওয়া যায় তাকে ‘ইলমে তাসাউফ‘ বলা হয়।”
ইলমে ফিক্বহ যেমন ইসলামের মৌলিক আলোচ্য বিষয়, ঠিক তেমনি ইলমে তাসাওউফ-ও ইসলামের মৌলিক আলোচ্য বিষয়। সামনে এর সংক্ষিপ্ত আলোচনা ধরা হল।

তাসাওউফের প্রয়োজনীয়তা
আলামা আলূসী বাগদাদী (রহঃ) তাঁর তাফসীরে রুহুল মা’য়ানীতে লিখেছেন, আল্লাহ্ পাক রাসুল (সাঃ) এর মাধ্যমে বলেন-
“আমি অজ্ঞাত গুপ্তভাণ্ডার ছিলাম। আমি পরিচিত হতে পছন্দ করলাম। তখন আমি জগত সৃষ্টি করলাম যেন আমি পরিচিত হই।” (রুহুল মা’য়ানী ২৭ পারা ২২ পৃ, মুনতাহিল মাদারিক-১৪২ পৃ, ফতুহাতে মক্কীয়াহ-১৪২ পৃ.)
আলামা আলূসী উক্ত বর্ণনার পর আরও বলেন-
-“নিশ্চয় এই বক্তব্যটি কাশ্ফের দ্বারা দৃঢ় বা শক্তিশালীভাবে প্রমাণিত। তা স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন আলামা শায়খ মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবী (রহঃ) তাঁর ফতুহাতে মক্কীয়াহ গ্রন্থের এক অধ্যায়ে।”
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) লিখেছেন-
“আল্লাহ্ সম্বন্ধে অজ্ঞ থাকা আত্মহত্যার নামান্তর”।(আল-মুনকিজু মিনাদ্দালাল)
শুধুমাত্র ইলমে ফিক্বহ বা শরীআ’তের মাধ্যমে আল্লাহর পরিচয় লাভ স¤ভব নয়, এজন্য ইলমে তাসাওউফ একান্ত প্রয়োজন।
ইলম শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে রাসূলুলাহ (সাঃ) বলেছেন:
“প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ইলম অর্জন করা ফরজ।”

এ প্রসঙ্গে ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) উলেখ করেছেন, “তিন প্রকার ইলম অর্জন করা ফরজ।

প্রথম প্রকার ইলমঃ ইলমে তাওহিদ (আল্লাহ্ পাকের একত্ববাদ সম্পর্কিত ইলম
দ্বিতীয় প্রকার ইলমঃ ইলমে বাতিন (আধ্যাত্মিক বিষয় সম্পর্কিত ইলম)
তৃতীয় প্রকার ইলমঃ ইলমে শরীয়া’ত (জাহেরী হুকুম-আহ্কাম সম্পর্কিত ইলম)
তিনি দ্বিতীয় প্রকার ইলমের ব্যাখা করতে গিয়ে উলেখ করেনঃ ইলমে বাতিন এতটুকু শিক্ষা করা দরকার যার দ্বারা অন্তরকে পাক-পবিত্র করার বিষয় সমূহ জ্ঞাত হওয়া যায় এবং কিসের দ্বারা তা স¤ভব তাও জানা দরকার। তবেই অন্তরে আল্লাহ ভীতি ও শ্রদ্ধাবোধ এবং আমল করার খাঁটি মনোভাব জন্ম হবে। তাছাড়াও নিয়্যত সঠিক করার প্রক্রিয়াদি এবং কিসের মাধ্যমে আমলগুলোকে কু-মন্ত্রণা, কু-প্রভাব হতে রক্ষা করা যায় তাহা জানাও একান্ত জরুরী। (মিনহাজুল আবেদীন)
তিনি অন্যত্র উলেখ করেন, “যেকোন প্রকারেই হোক, ইলম অর্জন করতে হবে। আর তা করতে যেয়ে অলসতা ও শিথিলতাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। নচেৎ গোমরাহীর বেড়াজালে গ্রেফতার হতে হবে।”(মিনহাজুল আবেদীন)

আলামা মোলা আলী ক্বারী হানাফী (রহঃ), তাঁর গ্রন্থ ‘মিরকাত’-এর প্রথম খন্ডে এরূপ অভিমত প্রকল্প করেছেন: “শরী‘আতের বিধি-বিধান যথাযথভাবে পালন না করলে মা‘রিফাত লাভ যেমন সম্ভব নয়, তদ্রুপ ইলমে মা‘রিফাতও সঠিকভাবে না শিখলে শরীয়াতের হুকুম-আহ্কামও ঠিকমত আদায় করা যায় না।”
সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী দাতাগঞ্জে বখ্শ হুজবেরী (রহঃ) বলেন, “হাকীকত (তাসাওউফ) ব্যতীত শরীআ’তের বাহ্য অনুরসণ করা শুধু রিয়া ও কপটতা। আর বাহ্য শরীআতের অনুসরণ ব্যতীত হাকীকতের দাবী করা সরাসরি যিন্দেকী ও এলহাদী। একরার ও তাসদীদের মতো শরীআ’ত এবং হাকীকত পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত এবং একে অন্যের প্রতি নির্ভরশীল। একটির অস্তিত্ব ছাড়া অন্যটির কল্পনা করা দুষ্কর।

শরীআ’ত দেহ; হাকীকত দেহের মধ্যে অবস্থিত আত্মার স্বরূপ। যেমন, দেহ ও রূহের সম্মেলনে হয় মানুষ। তদ্রুপ শরীআ’ত ও হাকীকতের সমন্বয়ে দীন তথা ধর্ম। হাকীকতের মানব জীবনের কার্যকরী প্রকাশ শরীয়াত। শরীআতের আমলের মধ্যে বাতেনী রুহ্ এবং নিয়তের আন্তরিকতাই হাকীকত। শরীআ’ত ছাড়া হাকীকত এবং হাকীকত ব্যতীত শরীআ’ত মূল্যহীন। নিয়তের বিশুদ্ধতা আল্লাহর প্রতি খাঁটি মহব্বত এবং তার যথার্থ ভয়ের সাথে কার্যকরী করার নামই হাকীকত। এবং তাসাওউফ।” (কাশফুল মাহ্জুব)

এ জন্য ইমাম মালিক (রহঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি শুধু ফিকাহ্ বা শরীয়াতের জ্ঞানার্জন করেছে কিন্তু তাসাওউফের জ্ঞানার্জন করেনি, সে ব্যক্তি ফাসিক। আর যে ব্যক্তি ইলমে ফিকাহ্ না শিখে, কেবল ইলমে তাসাওউফ শিখে সূফী হয়েছে, যে যিনদিক কারণ ফিক্হ শিক্ষা না করার কারণে সে কখনো নিজের আক্বিদা ও ঈমান ঠিক রাখতে সক্ষম হবে না। তাই যে ব্যক্তি ইলমে ফিকাহ্ তথা শরীয়াত ও তাসাওউফ উভয় প্রকার বিদ্যায় পারদর্শী, তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী (মুহাক্কিক)।
এ সম্পর্কে আবূ তালীব মাক্কী (র)-এর বক্তব্যটিও উলেখ যোগ্য। তিনি বলেছেন- “উভয় প্রকারের বিদ্যাই আসল।“
‘মাযাহের হক’ গ্রন্থে ১ম খন্ডে ‘বাবুল ঈমান‘ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে, “এটা জানা কর্তব্য যে, ধর্মের ভিত্তি এবং এর পূর্ণতা ফিকহ্, আক্বাইদ ও তাসাওউফের উপর নির্ভর করে।“

হাদিয়ে-বাঙ্গাল, মুজাহিদে-আজম, আলামা কারামত আলী জৌনপূরী (রহঃ) তাঁর কিতাবে লিখেছেন, “ইলমে তাসাওউফ ব্যতীত ইলমে শরীআতের উপর যথাযথ আমল করা কিছুতেই সম্ভব নয়।”

’দুরুরুল মুখতার’ গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, “অবস্থাভেদে তাসাওউফ শিক্ষা করা ফরযে আইন, কখনো ফরযে কিফায়া এবং কখনো মু¯াহাব। যে পরিমাণ তাসাওউফ শিক্ষার ফলে মানুষের চরিত্র বিশুদ্ধ ও মার্জিত হতে পারে, ততটুকু তাসাওউফ শিক্ষা করা ফরযে আইন। আর যে পরিমাণ তাসাওউফ শিক্ষার ফলে অন্যকে তা শিক্ষা দেওয়া যায়, এ পরিমাণ শিক্ষা করা ফরযে কিফায়া। আর যে পরিমাণ শিক্ষার ফলে ইলমে তাসাওউফের বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া যায়, সে পরিমাণ শিক্ষা করা মু¯াহাব।”

জামিউল উসুল কিতাবে উলেখ আছে, “ইলমে তাসাওউফ হচ্ছে বদ খাছলত সমূহ থেকে নাজাত বা মুক্তি পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম। । আর যেহেতু আল্লাহ্ প্রাপ্তির একমাত্র পথ রিপু বিনাশ ও আত্মশুদ্ধি অর্জন করা, সে কারণেই ইলমে তাসাওউফ শিক্ষা করা ফরজে আইন ।”

কাযী সানাউলাহ্ পানীপথী (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তাফসীরে মাযহারী‘-তে উলেখ করেন, “করণীয় ও বর্জণীয় বাতেনী আমলসমূহ, যেগুলোর জ্ঞানকে ‘ইলমে তাসাওউফ‘ বলা হয়ে থাকে, সে সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করাও প্রত্যেকের জন্য ফরযে আইন।”

ইসলাম ধর্মের ইলম প্রধানত দুই ধরনের যথাঃ জাহিরী ও বাতিনী । জাহিরী ইলম হচ্ছে শরীয়া’ত তথা ইলমে ফিক্বহ আর বাতিনী ইলম হচ্ছে ইলমে তাসাওউফ। তার প্রমাণ হল- হযরত আবু হুরাইরা (রাদিঃ) বলেছেন, ”আমি রাসূলে পাক (সাঃ) হতে দুই ধরনের ইলম শিখেছি….”।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Home
Account
Whatsapp
Search